বিসর্জন

বিসর্জন

“ভাই এবার কিন্তু আমাদের বিসর্জনটা বেশ বড় করে করতে হবে।“ হঠাৎ মিটিং এর মাঝে চেঁচাল নির্মাল্য।

“আগেরবার ওই পাশের পাড়ার ঐক্যময়ী ওদের বিসর্জনে ওইসব ডিজে-টিজে করে বিশাল ভাও খেয়েছে। সবাই ওদেরটা দেখার জন্যেই ভিড় করেছিল। এবার আমরাও নাহয় ওসবের জন্যে একটু টাকাটা বেশি রেখে এদিকে মদের জন্যে কিছু কম রাখলাম, দেখিস খুব কমও আবার রাখিস না”, বলে বিশ্রী একটা হাসি দিল সে।  

নির্মাল্য সোম, আমাদের “অগ্রদ্যুতি বয়েজ ক্লাব” এর অন্যতম সদস্য। আদতে পেঁচো মাতাল, পাড়ার বেকার দাদা। অথচ এই নির্মাল্য আর ওর মতন কিছু ‘ক্লাব প্রেমী’ লোকেদের নিয়ে আমাদের ক্লাব এর ৪১ তম বর্ষের পুজোর শেষ লগ্নের মিটিং। 

মিটিং এর বাকি সবাই ওর কথায় মাথা নাড়ল। ক্লাব প্রেসিডেন্ট অম্লানদাও সায় দিলো, “নির্মাল্য আইডিয়াটা মন্দ দেয়নি।”

আমি ভাবলাম, তা আর দেবে কেন, দশমীতে মদের আসরে একটু যদি উঁচু আওয়াজে গান বাজে তাহলে তো আলাদাই মজা। অগত্যা ক্যাশিয়ার হওয়ার বদান্যতায় আমাকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজি হতে হয়।

সেদিনের মত মিটিং শেষ করে প্রায় শেষ হওয়া প্যান্ডেলটার পাশ দিয়ে হেটে যেতে যেতে ভাবলাম, আজ দ্বিতীয়া, আর দুদিন পর পালপাড়া থেকে ঠাকুর আনতে যেতে হবে। পুজো তাহলে এসেই গেল।

“আরে হচ্ছে না, ওই বাঁদিকটা সোজা কর।” পেছন থেকে চেঁচায় অম্লানদা। আর ওমনি আমার পাশে দাড়িয়ে হাঁপাতে থাকা সোহমের মুখ থেকে ওর জন্যে হালকা আওয়াজে কাঁচা খিস্তি ভেসে এল।              

“নিজে তো কোনো কাজ করবে না, শুধু পেছনে দাঁড়িয়ে বড় বড় বাতেলা দেবে। প্রেসিডেন্ট বলে কি মাথা কিনে নিয়েছে? ঠাকুর নামাতে একটু হাত লাগানো যায়না নাকি!”  

আমি, সোহম আর আরো দুজন মিলে অসুর সমেত দুর্গা কে দাঁড় করাচ্ছিলাম। আমি ওকে বললাম, “কথা না বাড়িয়ে কাজটা কর চুপচাপ।“  

রাত সাড়ে বারোটা বাজে, এতক্ষণে প্রতিমা মণ্ডপে তোলা হল। সবাই এতটাই ‘ব্যস্ত’ যে আগে থেকে বলা সত্ত্বেও  প্রতিমাটুকু আনতে যাওয়ার জন্যেও লোক পাওয়া যায় না।

যাই হোক, সব ঠিকঠাক করে নিচে আসতে আসতে শুনলাম কে যেন বলছে, “ঠাকুরখানা এবার হেব্ব্যি হয়েছে, ঐক্যময়ীকে পুরো ধুয়ে দেব এবার।” 

পুজো তো নয় যেন ঐক্যময়ীর সাথে রীতিমতো যুদ্ধে নামছে এরা। 

“ষষ্ঠী পুজোর সময় হয়ে যাচ্ছে, পুরুত কোথায় ?” বদ্রি জ্যেঠু আমাকে জিজ্ঞেস করলেঙ। “দাঁড়াও আসছে”, আমি থামানোর জন্যে বলি ওকে।   

“টাকা নিয়ে মনে হয় কিছু একটা হয়েছে অম্লান দার সাথে, আমি দেখছি গিয়ে,” যেতে যেতে শুনলাম বদ্রি জ্যেঠু নিজেই বলছেন, “তোমাকে দুটো ফুল দেওয়ার আগেই নিজের ভাগের জন্যে টানাটানি শুরু করেছে যে!” 

পেছনে এসে দেখি পুরোহিত এর নতুন দাবি তার আরও টাকা লাগবে। অম্লানদা তাকে বলছে, “আপনার সাথে তো এরকম কথা হয়নি!” 

“তা আপনারা বলেছিলেন নাকি যে এরকম পুরো বিস্তারিত পুজো করতে হবে! আপনারা বলেছিলেন একটু নমো নমো করে পুজো করলেই হবে, সেকারণেই তো দুটো পুজোর মাঝেও আপনাদেরটা নিলাম যাতে একটু অ্যাডজাস্ট করে দু পয়সা এক্সট্রা কামানো যায়।” 

“বিস্তারিত পুজো! কেন?” 

“হ্যাঁ। আপনাদের ওই সামনে বসে থাকা বয়স্ক লোকটা অনেকক্ষন ধরে নানা রীতিনিয়ম আওড়ে যাচ্ছেন। ওসব করতে হলে কিন্তু এক্সট্রা টাকা লাগবে।”

“ওসব নিয়ে আপনাকে আমাদের কমিটির কেউ তো বলেনি।“

“না, তা বলেনি।“

“তাহলে আপনি ওনার কথা না শুনে, যতটুকু করতে বলা হয়েছে সেটাই করুন না!”

“আচ্ছা ঠিক আছে, তাই নাহয় করছি।”

কিছুক্ষণের জন্যে মনে হল নতুন ঝামেলা এল বুঝি। এরকম সময়ে এত তাড়াতাড়ি অন্য পুরোহিত কোথায় পাব। ফিরে এসে বদ্রি জ্যেঠুকে বললাম – পুরোহিত আসছে এবারে ঠিকঠাক করে পুজো শুরু হবে। জ্যেঠু কি বুঝল কে জানে, আপনমনে বললেন, “আর কি কখনও হবে!” 

“এই এক অষ্টমীর সকালে অত্যাচার, জানো তো সৌহার্দ্য দা,” আমার দিকে ঘুরে বলল সোহম।

“কিসের অত্যাচার?”

“আরে এই যে সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই স্নান করে পাঞ্জাবি পরে অঞ্জলি দিতে দৌড়াও“, সদ্য পাটভাঙা পাঞ্জাবির হাতা গোটাতে গোটাতে বলে, “এটা অত্যাচার নয়তো কি?” 

“বছরে একটা দিন নাহয় একটু ঘুমের স্যাকরিফাইস করলি, কি আর এমন হবে।”

“ওফ, ছেড়ে দাও, তুমি বুঝবে না।”

“বেশ।”

“তুমিও চলো, একসাথে দিয়ে দেই। ওহ সরি, তুমি তো দাও না ভুলে গিয়েছিলাম। সরি।”

“অতো সরির কিছু নেই, ওদিকে দ্যাখ কাকিমা ডাকছে তোকে।”

ওকে কাটিয়ে বাইরে এসে একটা সিগারেট ধরিয়ে ভাবলাম ছেলেটা অবাঞ্ছিত কিছু স্মৃতি উস্কে দিল, যার কোন দরকার ছিল না।

ঠিক এই সময়ে আমাদের পৌরপিতা সমর শাসমলকে দেখলাম সপরিবারে গাড়ি থেকে নামছে। প্রতিবার আমাদের ক্লাবেই তারা অঞ্জলি দিয়ে থাকে। অম্লানদাকে দেখলাম বত্রিশ পাটি বের করে আমাদের অন্যতম অর্থদাতাদের  আপ্যায়নে ছুটে আসছে।   

সিগারেটে শেষ টান দিয়ে মণ্ডপে ঢুকে কোণের দিকে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়লাম। অম্লানদা এসে সোহম কে ডেকে বলল পুরোহিত কে তাড়া লাগাতে, ভিআইপি লোকেরা অপেক্ষা করছে অঞ্জলি দেওয়ার জন্যে। 

পুরুত মশায় তখন একটা বড় দলকে সামলাচ্ছিল, মনে হলো তাদের দু একটা মন্ত্র বাদ দিয়েই অঞ্জলি শেষ করানোর চেষ্টা করছেন।

বাঃ এখনও মনে আছে তাহলে শ্লোকগুলো!

তখনই দেখলাম রেবাদি আসছে প্রায় হন্তদন্ত হয়ে, একটা পুরনো রংচটা শাড়ি পড়ে, তবে দেখে বোঝা যাচ্ছে ধোয়া সেটা, ময়লা নয়। রেবাদির আমাদের পাড়ার মোড়ে চা এর দোকান আছে। সন্ধেবেলা  ক্লাবে আসলে রেবাদির হাতের এক কাপ চা খেতেই হবে, নইলে আসাটাই বেকার।

দেখি রেবাদি অম্লানদাকে ডেকে কি যেন বলছে কিন্তু সে উত্তেজিত ভাবে হাত নেড়ে না করছে। সেইসঙ্গে আমাদের ভিআইপি-রাও অম্লানদাকে মানা করছে কিছু। ঢাকের আওয়াজে ঠিক করে কিচ্ছু শোনা যাচ্ছে না। সামনে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কী হয়েছে অম্লানদা? আর রেবাদি তুমি এখানে দাঁড়িয়ে কেন?” 

“সৌহার্দ্য তুই এখানেই ছিলি! আরে বলবি তো আগে! দেখ না রেবা কি বলছে এদিকে!” ব্যাজার মুখে আমার তাকিয়ে বলে অম্লানদা। রেবাদি বলল, “সৌ দাদা, ছেলের শরীরটা কদিন ধরে খুব খারাপ, হাসপাতালে ভর্তি। ওকে দেখতে যাব, তাই ভাবলাম আগেভাগে এসে ওর নামে একটু অঞ্জলি দিয়ে যাই। কিন্তু অম্লান বাবু কিছুতেই শুনছে না।” 

“আহ, রেবা দেখছো না শাসমল বাবুরা এবারে অঞ্জলি দেবেন, সেখানে তুমি যাও কি করে, বোঝো একটু!”   

“সব বুঝি আমি, কেন আমরা কি মানুষ নই যে ওদের পাশে দাড়িয়ে অঞ্জলি দিতে পারব না? ঠাকুর কি শুধু ওই বড় মানুষদের একার? আজকে ছেলেটাকে দেখতে যাব বলে এটুকু অনুরোধ করছি, সেটুকুও শুনতে চাইছ না,” চোখ মুছতে মুছতে বলে রেবাদি।

অম্লানদা কি বলবে আর বুঝে উঠতে পারে না। এতক্ষণে আমি বলি, “ রেবাদি শোনো, তোমাকে কেউ আটকাবে না আজ, তুমি দাও ওদের সাথেই অঞ্জলি। অম্লানদা, আমি নাহয় কথা বলছি ওদের সাথে।”

পরিস্থিতিটা আমাদের পৌরপিতাকে বুঝিয়ে বলতে কিছুটা অস্বস্তি, কিছুটা বিরক্তি আর কিছুটা শ্লেষ মিশিয়ে রাজি তো হলেন কিন্তু পরের বার যে চাঁদার পরিমানটা বেশ কমছে এটা ভাল মত বুঝলাম।

রেবাদিকে এসে বললাম, ”যাও, তুমি গিয়ে অঞ্জলি দাও আমি বলে দিয়েছি, আর ছেলের জন্যে একটু ফুল নিয়ে যেও।” 

কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল রেবাদি, “সৌ দাদা, আজকে যদি তোমার বাবা বেঁচে থাকতো…” আমি ওকে মন্ডপের দিকে পাঠিয়ে দিয়ে পেছনে নিজের চেয়ারে গিয়ে বসলাম। কিন্তু দেখলাম রেবাদি মণ্ডপে উঠেও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে অঞ্জলি না দিয়েই হঠাৎ চুপচাপ মুখ নিচু করে বেরিয়ে গেল। পরে গিয়ে শুনতে পেলাম শাসমলরা নাকি আবার কিছু একটা বলেছে রেবাদিকে উদ্দেশ্য করে, সেই অপমান সহ্য করতে না পেরে রেবাদি বেরিয়ে যায়। 

নাহ, আমারও আর এখন থেকে লাভ নেই, এই ভেবে বাইরে বেরিয়ে আবার একটা সিগারেট ধরিয়ে বাড়ির দিকে চললাম। ধোঁয়াটা ছেড়ে ভাবলাম, আজ একটা দিন নাহয় কয়েক হাজারের চাঁদা আর পাঁচ টাকার চায়ের ভাঁড় এক লাইনে দাঁড়িয়ে একসাথেই অঞ্জলিটা দিত, তাতে করে কি খুব অসুবিধে হত তোমার?

নবমীর রাত, ক্লাব থেকে ফিরতে বেশ দেরি হয়ে গেল। কিছু হিসেব বোঝানোর ছিল। কাল দশমীর ভাসানের উদ্দাম নাচ গানের জন্যে ডিজে আর সুরা পানের এক্সট্রা খরচ ক্লাব ফান্ড থেকেই গেল। ওই টাকায় এবার শীতে আমাদের কিছু কম্বল বিতরণের কথা ছিল। কিন্তু শীতে গরীব দুটো মানুষকে উষ্ণতা প্রদানের চেয়ে দশমীতে মাতাল হয়ে নেচে গা গরম করাটা বেশি জরুরী। ফুটপাথের লোকগুলো তো নাহয় সারা বছর ওরকম কষ্টেই থাকে আর শীতেও থেকে যেতে পারবে, কিন্তু পুজোটা তো আর রোজ রোজ আসবে না! আমার এসব ব্যাপারে ঢোকার কোন ইচ্ছে নেই, তাই ওদের হিসেব বুঝিয়ে চলে এলাম।

কালকের জন্যে আনা রজনীগন্ধা গুলো কফি টেবিল এর ওপর রাখতে গিয়ে চোখে পড়ল মা এখনও খাবার টেবিলে বসে আছে, সামনে খাবার ঢাকা।

“এখনও জেগে আছ কেন? তোমাকে তো বললাম আমার আসতে রাত হবে, তুমি খাবারটা বেড়ে রেখে শুয়ে পড়ো“, জুতো খুলতে খুলতে বললাম।

“আর তুইও খুব ভাল করেই জানিস যে তুই না এলে আমার ঘুম আসবে না,” বোঝাই যাচ্ছে মা বেশ রেগে আছে।

“ঠিক আছে বুঝেছি, হাতটা ধুয়ে আসি দাঁড়াও।”

হাতমুখ ধুয়ে এসে দেখলাম টেবিলে পঞ্চব্যঞ্জন সাজানো।  

“এত রাতে এত কিছু আমি খেতে পারব না, মা।”

“তুই রাত করে এসছিস, কাজেই দোষটা তোর। সেখানে খাবার নষ্ট করবি না, যা আছে খেয়ে নে। কাল এমনিতেও এসব কিছু রাখা যাবে না।“  

আর কথা না বাড়িয়ে রাত একটায় সুক্তো দিয়ে ভাত মাখা শুরু করলাম।

“ক্লাবে যাওনি?”

“না।”

“কেন?”

“তুই জানিস কেন।”

“মা, এখনও?”

“এতে এখনও-র কিছু নেই।”

“তেরো বছর হয়ে গেল বাবা মারা যাওয়ার।এখনও শুধু একটা ব্যাপারকে ধরে বসে আছ।”

“কে বলেছে আমি শুধু ওই ঘটনার জন্যে যাই না? তোর বাবা বিসর্জনে ঠাকুর ভাসাতে গিয়ে মারা গেলেন এতে কারও  কিছু করার ছিল না। পুরোটাই নিয়তি।”

“তাহলে?” 

“এতদিন কিছু জানতে চাসনি, হঠাৎ আজ এত প্রশ্ন করছিস যে?”

“আমি চেয়েছিলাম জানতে, তুমি এড়িয়ে গিয়েছ সবসময়।”

“হুম, বুঝলাম, মাছের ঝোলটা নে আরেকটু।”

“কি হল, আজও এড়িয়ে যাবে?”

“শোন বাবান, তোর বাবাই ছিলেন ক্লাব এর শেষ লোক যিনি ক্লাব টাকে বখে যেতে দেননি। তাতে উনি অনেকের চক্ষুশূলও হন। সামনা সামনি কেউ কিছু না বললেও কানে আসতো। তাও তাকে কিছু বলিনি, ভাবতাম শুনলে কষ্ট পাবেন, কিম্বা নিজেও হয়ত জানতেন সবটাই, মুখ ফুটে কিছু বলেননি। উনি মারা যাবার পর থেকেই একে একে বদ্রিদা, শ্যামলদা, প্রবীরদা-রা সব ক্লাব ছেড়ে দিলেন। কেন জানিস? কারন ক্লাবটাতে ভেতর থেকে ঘুণ ধরতে শুরু করেছিল। নতুন যারা এল তারা ক্লাবটাকে আরও উচ্ছন্নে নিয়ে গেল। তোর বাবা অগ্রদ্যুতিকে ভীষণ ভালবাসত, তাই তার ভালবাসাকে এইভাবে অশ্রদ্ধা, অপমানিত, মলিন হতে দেখতে চাইনি আমি। তাই ক্লাবের পুজোতে যাওয়াও বন্ধ করে দিলাম।”   

“তুমি কি ভাব মা, ক্লাবটা এখন পুরোপুরি শেষ?”

“এই প্রশ্নের উত্তর তুই নিজেও জানিস বাবান, আমার চেয়েও ভাল। পুজোর নামে এখন যা চলে সেটা নাহয় নাই বা চোখে আঙুল দিয়ে দেখালাম তোকে। পুজোতো এখন শুধু উপলক্ষ মাত্র ওদের কাছে। সবাই আছে শুধু নিজের আখের গোছানো আর ফূর্তির ধান্দায়। মা এর পুজোয় ভক্তিটাই তো নেই রে।”


Liking this? Become a patron to read more such stories
Become a Patron!


“আমিও কিন্তু ওই ক্লাব, ওই পুজোতেই আছি।”

“সে আমার তোর ওপর ভরসা আছে। তুই অন্তত তোর বাবার আদর্শ গুলোকে সম্মান দিবি, চোখের সামনে অন্যায় কিছু দেখলে প্রতিবাদ করবি জানি। সে কারণেই আমি তোকে ক্লাব এর কোন কিছু থেকে আটকাইনি।” 

“আমার খাওয়া শেষ, তুমি ঘুমোতে যাও। আর ফুলগুলো টেবিলে রাখা আছে, কাল সকালে বাবার ছবিটায় লাগিয়ে দিও।”

“হ্যাঁ দেব, যা তুইও শুয়ে পর, অনেক রাত হল।”

হাতটা ধুতে ধুতে মনে হল, সত্যিই কি আমি বাবার আদর্শ গুলো কে সম্মান দিতে পেরেছি?

কড়ি আর কাঁচা হলুদ নেওয়ার জন্যেও যে এরকম প্রতিযোগিতা হতে পারে তা আমাদের পাড়ার জেঠিমা, কাকিমা আর বৌদিদের দেখলে বোঝা যায়। আর সেটা এতটা মারাত্মক পরিমাণে হয় যে হাতাহাতি আর চুলোচুলিটা শুধু অল্পের জন্যে বাকি থাকে। পুরুতঠাকুর তো ওপর থেকে ছিটিয়েই ক্ষান্ত। মায়েদের দেখে বাচ্চাগুলো যে কি শিখছে কে জানে!  

সিঁদুরখেলা পর্ব মিটলে ক্লাব মেম্বাররা সব একে একে ক্লাব ঘরে এসে উপস্থিত হল। সোহম আর অনিমেষ কে পেছনে দাঁড়ানো ট্রাক আর বাকি গাড়িগুলো কে মণ্ডপের সামনে এনে দাঁড় করাতে পাঠিয়ে দেই। কিন্তু এরই মধ্যে দেখি নির্মাল্য বোতল বের করে গ্লাস সাজিয়ে বসেছে। আমি বলি, 

“নির্মাল্য, এখনই এসব নিয়ে বসার কি দরকার আছে? ওদিকে প্রতিমা মণ্ডপ থেকে বের করতে হবে, গাড়ি চলে এসেছে অনেকক্ষণ।”

“আরে ধুর, দাঁড়াতো! এখন একটু পেটে না পরলে ভাসানের জন্যে জোশ আসবে কিভাবে শরীরে? আর ভাসানটা একটু এনার্জি দিয়ে না করলে ঠাকুর পাপ দেবে।”  বলেই দাঁত বের করে ওর বিশ্রী হাসিটা দিল। “তুই একটু পারলে বাইরে গিয়ে বল ওই ঢাক বাজানো থামিয়ে গান বাজাতে জোরে।” 

ওকে দেখাদেখি প্রায় সবাই দেখলাম গ্লাস নেওয়ার জন্যে ঝুঁকে পরল। 

এরকম অস্বস্তিকর পরিবেশে থাকাটা অসম্ভব। ঘরের বাইরে এসে সবে সিগারেটটা ধরাতে যাব, সোহম দেখি দৌড়তে দৌড়তে আসছে।

“সৌহার্দ্য দা, আগুন…”

ওকে কথা শেষ না করতে দিয়েই ছুটলাম প্যান্ডেলের দিকে। আমার আসার আগেই দেখি আরো লোক এসে পড়েছে। কেউ বলছে দমকলে খবর দিতে, কেউ বলছে জল আন, কেউ ফায়ার এক্সটিংগুইশার চালানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে। কে কি করবে বুঝে পাচ্ছে না। পুরো পরিস্থিতিটাই  বিশৃঙ্খল, উন্মাদ। 

আর এসবের মধ্যে দাঁড়িয়ে আমি দেখতে পাচ্ছি আগুন এবার একটু একটু করে প্রতিমাকে গ্রাস করছে। আগুনের হল্কা এসে লাগছে মায়ের মুখে। চোখের কোণটা চকচক করছে নাকি রঙ গলে যাচ্ছে, ঠিক বুঝলাম না।

Image Credits: Shutterstock


Read More: এবার পুজোয় নিজের হাতে সাবেকি দুর্গাপ্রতিমা গড়ে মাকে আবাহন ১৫ বছরের দিশিতার 

Share This Story
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *