নামে কীই বা আসে যায়

নামে কীই বা আসে যায়

রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘যাহার নাম ভূতনাথ, তাহাকে নলিনীকান্ত বলিলেও তাহার অসহ্য বোধ হয়।’ একশো ভাগ ঠিক কথা। মানুষের চেয়েও আগে তার নাম। নাম পছন্দ হয়নি বলেই গন্ধর্বনারায়ণ হয়েছিলেন দীনবন্ধু মিত্র। আবার নাম যে সর্বদা যথাযথ হয় তাও নয়। বিধাতার এমনই খেয়াল যে অতি কদাকারকেও তিনি নাম দিয়ে ‘কন্দর্পকান্তি’ বানিয়ে ছাড়েন। রবীন্দ্রনাথই পরে বোবা মেয়ের নাম দিয়েছিলেন সুভাষিণী। আবার অনেক সময় নামের পরিধি বেড়ে যায়। ভুবনবিজয়ী গ্রিক সম্রাট আলেকজান্ডারের নামের মানে ‘যিনি রক্ষা করেন’। বলাই বাহুল্য, রক্ষাতেই তিনি থামেননি, ঈজিয়ান সাগরের তীর থেকে জয়পতাকাকে উড়িয়ে এনেছিলেন সিন্ধুনদের তীরে।

এই তালিকায় সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক যে নামটি আসা উচিত, তিনি আজ হিন্দুস্তানের বাদশাহ হিসেবে আসমুদ্রহিমাচল-সহ সারা পৃথিবীতে পরিচিত। স্বনামখ্যাত মুঘল সম্রাট হুমায়ূন। ফারসিতে “হুমায়ূন” (همایون) শব্দের অর্থ, যে ভাগ্যবান। তাঁর সম্পর্কে ঐতিহাসিক স্ট্যানলি লেন পুলের একটি বিখ্যাত উক্তি হল, “ইতিহাসে এমন ভুল নামকরণের নজির আর বোধ হয় দ্বিতীয়টি নেই!” মুঘল বাদশাহদের মধ্যে মহান যেমন ছিলেন, তেমনই চরম অপদার্থ সম্রাটও ছিলেন। কিন্তু হুমায়ূনের মত দুর্ভাগা বোধ হয় আর কেউ ছিলেন না। সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হবার পর হুমায়ূন বেশ ওজনদার নাম নিয়েছিলেন, ‘নাসির-উদ’দীন মুহম্মদ হুমায়ূন”।

সম্রাট হুমায়ূন

মুঘল সম্রাটদের এরকম গালভরা নাম সবারই ছিল, সম্রাট আকবর ছিলেন জালাল-উদ’দীন, জাহাঙ্গীর ছিলেন নূর-উদ’দীন। ফারসিতে ‘নাসির’ মানে রক্ষাকর্তা, নাসির-উদ’দীন, মানে, যিনি ইসলামের রক্ষক ও ধারক। অথচ হুমায়ূনের ভাগ্যে সেইটেও জোটেনি, শের শাহের হাতে সিংহাসন হারিয়ে পারস্যে আশ্রয় নিতে হয়েছিল তাঁকে একটিই শর্তে, সুন্নী থেকে শিয়া হতে হবে। আগে প্রাণ, তারপর ধর্ম। প্রাণের বিনিময়ে ধর্মরক্ষার রোমান্টিক কাহিনী যুগ যুগ ধরে চলে আসছে আমাদের কাছে। শির দিব তবু সার নাহি দিব। হুমায়ূনের গল্পে এরকম কোনও সুপারম্যান নেই। পারস্যের সফভী (Safavid) শাহ তেহ’মোশপের কাছে আশ্রয় নিয়েছিলেন সুন্নি থেকে শিয়া হয়ে।

Shah Tahmasp I in the mountains (cropped).jpg
শাহ তেহ’মোশপ

শিক্ষাই অগ্রগতির মুখ। অন্তত সভ্য মানুষ মাত্রেই আমরা এ’কথা মানি। মুঘল ইতিহাস সেখানেও বেশ মজাদার। মুঘল ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যানুরাগী ও বিদ্বান সম্রাট ছিলেন বাদশাহ হুমায়ূন। চারটে ভাষা জানতেন (আরবি, ফারসি, তুর্কি, হিন্দুস্তানি—আজকের হিন্দি ও উর্দুর পূর্বসুরি), পড়াশুনার নেশা ছিল রীতিমত। এদিকে তিনি রাজত্বটাই রাখতে পারেননি।

অন্যতম বিদ্যানুরাগী ও সম্ভবত কাব্যমোদী জাহাঙ্গীর সম্পর্কে মানুচ্চি লিখেছিলেন, তাঁর বাবা যা যা জয় করেছিলেন, জাহাঙ্গীর সেসবের বারোটা বাজিয়েছিলেন। বাস্তব জীবনে জাহাঙ্গীর ছিলেন তীব্রভাবে মদে আসক্ত, নেশায় প্রায় চুর হয়ে থাকতেন বেশিরভাগ সময়। জাহাঙ্গীরের দিনলিপিতে আছে, শিকার নিয়ে তিনি মাত্রাতিরিক্ত উৎসাহী ছিলেন। একবার শিকার করার সময় টার্গেট ফস্কে যাওয়ায় দুই নিরীহ ক্যানেস্তারা-পিটিয়েকে তিনি প্রাণদণ্ড দিয়েছিলেন! শাহজাহান সম্পর্কে সেভাবে কিছু জানা যায় না, তবে তিনি যে সাক্ষর ছিলেন এটুকু জানা যায়। ঔরঙ্গজেব নেশা থেকে দূরে থাকতেন, বাস্তব জীবনে ছিলেন ‘জিন্দা-পীর’, ইসলামী দর্শন ও ইতিহাসের ওপর গভীর জ্ঞান ছিল তাঁর। তবু বিধর্মীর প্রতি উদারতা দেখাতে পারেননি, অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ ও ক্ষুদ্র জীবনদর্শনে বিশ্বাস করতেন।

অথচ, মুঘল এবং সারা পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্রাট মহামতি আকবর ছিলেন মহৎ হৃদয়, মানবপ্রেমিক, বিদ্যানুরাগী, সর্বোপরি, পরধর্মের প্রতি সহিষ্ণু। সমস্ত ধর্মের সারকথা শুনতে তিনি আসর বসাতেন। পৃথিবীতে সম্ভবত আর কোনও মুসলিম শাসক নেই যিনি প্রায় আলাদা একটি ধর্মমত প্রচার করেছিলেন এবং তার চেয়েও বড় কথা, সেটা কারোর ওপর চাপিয়ে দেননি। এমন উদারমনা সম্রাট জালাল-উদ’দীন একটি অক্ষরও লিখতে জানতেন না। আধুনিক রিসার্চ বলে, তারে-জমিন-পরের ঈশানের মত তাঁর সম্ভবত ‘ডিসলেক্সিয়া’ ছিল। কেমব্রিজ ঐতিহাসিক জন রিচার্ডসের মতে, তাঁর নাকি মৃগীও ছিল (John Richards, The New Cambridge History of India, 1993, Cambridge University Press, P.34)!

শুধু তাই নয়। সমগ্র মুসলিম ইতিহাসের সবচেয়ে শিক্ষিত, বিদ্যানুরাগী ও উদার শাসকের নাম শুনলে অনেকেই চমকে উঠবেন। স্বয়ং মুহম্মদ-বিন’তুঘলক!

রোমান্টিক জীবনী যদি কারোর আদতে থেকে থাকে, সেটা বাবর। এখানে অবশ্যই রোমান্স অর্থে প্রেম নয়। যদিও বাবরের জন্ম ভ্যালেন্টাইনস ডে’র দিন, অর্থাৎ ১৪ ফেব্রুয়ারি, ১৪৮৩। কিশোর বয়সে ফারঘানার রাজা হওয়া, তারপর সমরখন্দ জয় করতে গিয়ে ফারঘানা অবধি হাতছাড়া হওয়া—বাবরের রূপকথার মত ছেলেবেলার গল্প আমরা কমবেশি সবাই জানি। একটা সময় পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতেন, সেখান থেকে স্রেফ প্রখর বুদ্ধি আর দূরদর্শিতায় হিন্দুস্তান জয় করেছিলেন। বাবরের পানিপথের প্রথম যুদ্ধ জেতার গল্পও কম রোমহর্ষক নয়। ১২ এপ্রিল থেকে ১৯ এপ্রিল, ১৫২৬, আট দিন ধরে দুই সৈন্য পানিপথের প্রান্তরে ঠায় অপেক্ষা করেছিল। স্নায়ুযুদ্ধ। যাতে অবশ্যই লোদী সৈন্যরা এগিয়ে। কারণ বাবরের বারো হাজার সৈন্যের মুখোমুখি হয়েছে সুলতান ইব্রাহিম লোদীর এক লাখ পদাতিক, এক হাজার রণহস্তীবাহিনী। কিন্তু মাঠে নামার পর খেলা ঘুরে গেল। আমরা জেনে এসেছি, বাবর কামান দেগে হারিয়েছিলেন। আসলে কামানের গল্প পুরোটাই বাবরনামার অনুবাদের গলদ। অ্যানেট বেভারিজের মান্যতম অনুবাদ পড়লে দাঁড়ায়, আসলে নাকি দু’তিনটের বেশি কামান ছিল না এবং পুরোটাই বাবরের স্ট্র্যাটেজি এবং দুর্ধর্ষ তীরন্দাজদের কৃতিত্ব! ২৭ এপ্রিল, ১৫২৬ সাল। দিল্লির জামা মসজিদের খুতবা পড়া হল কাবুলের রাজার নামে। যিনি এখন হিন্দুস্তানেরও অধিপতি।

First Battle of Panipat - Wikipedia
প্রথম পানিপথের যুদ্ধ

মহাভারতে যে ভাইয়ে ভাইয়ে বিবাদের গল্প আছে, ভারতে ইসলামী ইতিহাসের প্রতিটি পর্ব তাকে সোনার অক্ষরে ঠাঁই দিয়ে গেছে। এই ব্যাপারে সবচেয়ে দুর্ভাগা ছিলেন হুমায়ূন। তৈমুরের বংশে কোনও উত্তরাধিকার নীতি ছিল না। কারোর যদি চার ছেলে থাকে তাহলে বাপ মরলে চার পোলাপানই চরম দাবিদার হতে পারে। যার ফলে সিংহাসনের বসার পরেই অনেক সুলতানের প্রথম কাজ হত আপন ভাইবোনদের নিকেশ করা! হুমায়ূনের সেদিকেও বোধ ছিল না। ছিলেন অতীব সহজ সরল। বড় ছেলে হিসেবে সিংহাসনে বসলেন, বাবার পাশে পাশে পানিপথে, খানুয়ায় যুদ্ধ করেছেন। তখতে বসেই নিজের তিন ভাই মির্জা কামরান, মির্জা হিন্দাল, মির্জা আশগরীকে কাবুল, কান্দাহার আর আলওয়ালের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। এইখানেই শুরু হয় বিপত্তি। তিন ভাইই ক্ষমতা পেয়ে প্রথম যে কাজটা করেন, তা হল আছোলা বাঁশ নিয়ে বড়দার পিছনে লেগে পড়া। কামরান রীতিমত স্বাধীন হয়ে যান এবং দিল্লির বশ্যতা সবরকমভাবে অস্বীকার করেন। এদিকে ভাইয়ের প্রতি স্নেহশীল বড়দা হুমায়ূন উলটে কামরানকে আরও কিছু রাজত্বের অংশ ছেড়ে দেন। যার ফলে এক বিরাট অংশ হাতছাড়া হয়ে যায় তাঁর।

পার্সিভ্যাল স্পিয়ার হুমায়ূনের সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘প্রবলেম চাইল্ড’। আদতে, প্রতিভা থাকলেও তাঁর মধ্যে অধ্যবসায় ছিল না। এটা বোঝা যায় দুটো যুদ্ধে হুমায়ূনের গতিপ্রকৃতি দেখলে। গুজরাটের বাহাদুর শাহ এবং বিহারের শের শাহের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জিতে গিয়েও হুমায়ূন হেরে যান। কারণটা অদ্ভুত। দুইজনই প্রথমে পরাজিত হন এবং মুঘলবাহিনী সদর্পে তাদের রাজধানী দখল করে। কিন্তু দুইবারই, রাজধানীতে ঢুকে হুমায়ূন সটান সেখানেই কিঞ্চিৎ জিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এখানে ‘কিঞ্চিৎ’ মানে অবশ্যই তা মুঘল মাপকাঠিতে। অতএব ঢালাও তোষামোদের বন্দোবস্ত হল। গুজরাত তাও শুখা বন্দর, বাংলা একেবারে শস্যশ্যামলা সুজলা সুফলা সমৃদ্ধ সুবা। শত্রুকে পরাজিত করে তারই রাজধানীতে আয়েশ করা ফ্যান্টাসি থ্রিলার হলে চলত, কিন্তু বাস্তবে যা হবার সেটাই হল, দুইবারেই পরাজিত দুই রাজা ওই সময়ে শক্তি সঞ্চয় করে ফিরতি আক্রমণ করেন। হুমায়ূনের ফেরার পথ আটকে বিলগ্রামের প্রান্তরে পাঁচ বছরের জন্য মুঘল সাম্রাজ্যের সমাধি খুঁড়ে দেন শের শাহ সুর।

Sher Shah Suri - Wikipedia
শের শাহ সুরি

আমোদের বা আরামের সুযোগ তারপর হুমায়ূনের আর জোটেনি। গুলবদন বেগমের লেখা ‘হুমায়ূন-নামার’ এই অংশটি বড়ই করুণ। রাজপুতানা থেকে কান্দাহার অবধি পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছিল হুমায়ূনকে। ক্লান্তিতে, অনিয়মে শরীর ভঙ্গুর। শেষে আশ্রয় জুটেছিল পারস্যরাজের দরবারে। সেখানে পারস্যাধিপতি সসম্মানে হুমায়ূনকে আমন্ত্রণ জানালেও একই সঙ্গে শিয়া ধর্মমত গ্রহণের জন্য পীড়াপীড়ি করেছিলেন। একজন সুন্নির কাছে শিয়াতে রূপান্তরিত হওয়া সম্ভবত হিন্দু হয়ে যাওয়ার থেকেও বেশি অপমানের! প্রাণের ভয়ে হুমায়ূন সেটাও মেনে নিতে বাধ্য হন।

এত কিছু যার জন্য, সেই হিন্দুস্তানের পুনরুদ্ধার তিনি করেছিলেন। কিন্তু সুখ আর হুমায়ূনের জীবনে আসেনি। ২৪ জানুয়ারি, ১৫৫৬। বই হাতে লাইব্রেরি থেকে ফিরছিলেন, হঠাৎ আজানের ঘোষণা শোনা গেল। ধর্মপ্রাণ সম্রাট তাড়াহুড়ো করে হাঁটু মুড়ে বসতে গিয়ে সটান সিঁড়ি দিয়ে আছাড় খেয়ে পড়ে গেলেন। আর উঠে দাঁড়ানো হয়নি তাঁর।

মুঘলদের অদ্ভুত রীতি ছিল, মৃত্যুর পরেও একটা নামকরণ করা। হুমায়ূনের নাম হয়েছিল জন্নত-আশিয়ানী। গুলবদন বেগমের ‘হুমায়ূন-নামা’র মূল ‘টেক্সট’-টি শুরু হয়েছে এইভাবে, “আদেশনামা ধ্বনিত হল। ‘ফিরদৌস মাক’ঈয়ানী’ এবং ‘জন্নত-আশিয়ানী’-র কৃতকর্মের ব্যাপারে যা জানো লেখো। পৃথিবীর অধিপতি ‘ফিরদৌস মাক’ঈয়ানী’ যখন লোকান্তরিত হ’ন, এই অধম কন্যার বয়স তখন নিতান্তই আট। তাই স্মৃতি কতদূর সঙ্গ দেবে জানি না। যাই হোক, তদ্যপি সম্রাটের আদেশ অলঙ্ঘনীয়, তাই আমার শোনা এবং জানা কথা যতদূর সম্ভব স্মরণ করে আমি লেখনী আরম্ভ করলাম।” (Translated from Persian, Annette S Beveridge, PP 83-84, বাংলায় অনুবাদ আমার) বলাই বাহুল্য, বাবরের নামকরণ হয়েছিল ফিরদৌস মাক’ঈয়ানী।

মানুষ হিসেবে বাবর কেমন ছিলেন? বিভিন্ন ঐতিহাসিক রেকর্ড আছে এই নিয়ে। কয়েকটা পড়লে মনে হবে, অত্যন্ত বর্ণময় এবং খেয়ালি চরিত্র! যখন যেটাতে কাজ হবে ভেবেছেন, করেছেন—এবং আশ্চর্যভাবে, সেগুলো খেটেও গেছে। এরকম খামখেয়ালি লোক ইতিহাসে আরেকজন ছিলেন, ভুবনবিখ্যাত গ্রিক সম্রাট আলেকজান্ডার। বাবর মাত্র এগারো বছরে রাজা হয়েছিলেন। ওই কিশোর বয়সেই সমরখন্দের তখতের খোয়াব দেখেছিলেন। হিন্দুস্তান জয়ের কোনও পরিকল্পনাই তাঁর ছিল না, কখনও হিন্দুস্তানে থাকবেন বলেও ভাবেননি। অথচ ভারতীয় ইতিহাসের এক বিশাল অধ্যায় তাঁকে নিয়ে।

প্রথম যখন কান্দাহার, দীপালপুর অভিযান করলেন, আফগানদের ভয় দেখানোর জন্য শয়ে শয়ে নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছিলেন! আবার দিল্লি দখলের পর বার বার চেষ্টা করেছেন সাধারণ মানুষের মন জয় করতে। “বাবরনামা”-তে নিজেই লিখেছেন, ‘অদ্ভুৎ লাগছে, এখানকার স্থানীয়রা আমাদের ঘৃণা করে। তাদের সঙ্গে কিছুতেই মেশা যাচ্ছে না। আমাদের সৈন্যদের দেখলেই তারা পালিয়ে যাচ্ছে!’ মহারাণা সংগ্রাম সিংহের সঙ্গে যুদ্ধের ইতিহাস আরও সরেস। ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে সম্ভবত রাজপুতদেরও কিছু যোগাযোগ ছিল বলে বিভিন্ন ইতিহাসবিদ মনে করেন। আবার এই এই সংগ্রামের বিরুদ্ধেই যখন বাবরকে অস্ত্র ধরতে হয়, জীবনে ওই একবারই তিনি ডাক দিয়েছিলেন ‘কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার’। দিল্লি দখল হলেও আফগান মুসলমান এবং রাজপুতদের দাপটে সেই সদ্যোজাত মুঘল সাম্রাজ্য টলোমলো। তার ওপর নিজের অনুচররা স্বদেশ থেকে এতদূরে এসে ক্লান্ত। বাড়ি ফিরতে চায়। তখন তাদের ঐক্যবদ্ধ করতে এছাড়া উপায় দেখলেন না। এদিকে সংগ্রাম যতই ষড়যন্ত্র করুন, আদতে তিনি দুর্ধর্ষ শিশোদীয় রাজপুত নেতা। শোনা যায়, তাঁর এক হাত আর এক চোখ ছিল না, সারা দেহে আশিটি দগদগে ক্ষতচিহ্ন ছিল। তাঁর অধীনে রাজপুত সৈন্যের নামে তখন রাজপুতানা থেকে কামরূপ অবধি আর্যাবর্ত কম্পমান। রাজপুত শাসকরা সবাই সংগ্রাম সিংহকে তাঁদের ভুবনবিজয়ী নেতা বলে মানে। তাঁর কথায় শুধু রাজপুত ঘোড়সওয়ার সৈন্যই নেমেছিল প্রায় এক লক্ষের কাছাকাছি। ফলে শাসনের ব্যাপারে, এমনকি সৈন্য সংগ্রহের ব্যাপারেও যিনি হিন্দু-মুসলিম ভেদ করতেন না, কেবল একবার সেই বাবর উপাধি নিলেন ‘গাজী’। খানুয়ার পাহাড়ি উপত্যকায় রাজপুতবাহিনী প্রবল যুদ্ধ করেও হেরে গেল।

Babur - Wikipedia
সম্রাট বাবর

হিন্দুস্তানকে বাবর যতটা গভীরভাবে দেখেছিলেন, অতটা গভীর দৃষ্টি সম্ভবত আলেকজান্ডারেরও ছিল না। “বাবরনামা” বাবরের অতুল কীর্তির একটি। পনেরশো শতকের ভারতের যে মনোজ্ঞ খুঁটিনাটি বর্ণনা বাবর দিয়েছেন, অমনটি খুব কম পর্যটকই দিতে পেরেছেন। একটা ছোট্ট উদাহরণ দিই। ভারতীয় সাল এবং দিন গণনার পর্যায় নিয়ে বাবর লিখেছেন, “হিন্দের অধিবাসীরা বছরকে তিনটি ঋতুতে ভাগ করে প্রতিটিতে চারটে করে মাস রেখেছে। চৈত, বোশাখ, জেঠ, আষাঢ়, সাওয়ান, ভাদো, কুয়ার, কাতিক, আঘান, পুষ, মাঘ, ফাগুন। দিনরাত মিলিয়ে সমগ্র সময়কে চব্বিশ ভাগে ভাগ করেছে, একেকটা ভাগকে বলে ঘড়ি। প্রতিটা ভাগ আবার ষাট ভাগে বিভক্ত।” আর সপ্তাহের দিনের নাম হিন্দুস্তানে কেমন ছিল? সরাসরি বাবরনামা থেকে তুলে দিচ্ছি, To the days also they have given names—sanichar is Saturday; Rabībār is Sunday; Som-war is Monday Mangal-war is Tuesday: Budh-bār is Wednesday; Brihaspat-bār is Thursday; Shukr-bār is Friday).” (Annette S Beveridge, Baburnama: A Memoir, New Delhi, Rupa&co, PP 366-369).


 

Share This Story
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

2 thoughts on “নামে কীই বা আসে যায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *